১ কোটি ২ কোটি নয় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে প্রায় ৭শ ২০ কোটি টাকার খাদ্যশস্য প্রকল্পের পুরোটাই শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে আসছে বান্দরবান জেলা পরিষদ। ফাঁকি দেওয়ার পেছনে রয়েছে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ, নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ সহকারী প্রকৌশলী ও হিসাব রক্ষক।
বান্দরবান জেলা পরিষদের এই অনিয়ম, লুটপাট ও দুর্নীতি দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদকে হার মানিয়েছে বলে জানায় বান্দরবানের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
সরকার যেখানে দাতব্য প্রতিষ্ঠান, মসজিদ মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা, রাস্তাঘাট সংস্কার ও ছোটখাটো ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণের জন্য এই খাদ্যশস্য প্রকল্পগুলো দিয়ে থাকে। সেখানে কাগজেপত্রে নামমাত্র ও অস্থিত্বহীন প্রকল্প সাজিয়ে ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাত করে পুরোটাই শুভংকরের ফাঁকি দিয়েছে বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লাসহ নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান, উপ সহকারি প্রকৌশলী থোয়াই চ মং, হিসাব রক্ষক উসাজাই মারমা। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার মতো সাহস কারো নাই বান্দরবানে। এভাবে দুর্নীতি করতে করতে একেকজন শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অর্থাৎ বিগত ১৬ বছরে বান্দরবান জেলা পরিষদে খাদ্যশস্য প্রকল্পের চাল বরাদ্দ আসে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার টন এবং গমের বরাদ্দ আসে প্রায় ৮০ হাজার টন। গড়ে চালের দাম যদি প্রতি টনে ৪০ হাজার টাকা করে ধরা হয় তাহলে ১ লক্ষ ২০ হাজার টনের দাম আসে ৪৮০ কোটি টাকা। গমের দাম যদি টন প্রতি গড়ে ৩০ হাজার টাকা ধরা হয় তাহলে ৮০ হাজার টনের দাম আসে ২৪০ কোটি টাকা। সুতরাং চাল আর গম মিলে খাদ্যশস্য প্রকল্পে বান্দরবান জেলা পরিষদে বিগত ১৬ বছরে বরাদ্দ এসেছে সর্বমোট প্রায় ৭শ ২০ কোটি টাকার।
কিন্তু এই ৭ শ ২০ কোটি টাকার খাদ্যশস্য প্রকল্পগুলো পুরোটাই অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ভরা। কাগজেপত্রে সব ঠিক রেখে ভুতুড়ে প্রকল্প তৈরি করে শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে আসছে বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লাসহ, নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান, উপ সহকারি প্রকৌশলী থোয়াই চ মং, হিসাব রক্ষক উসাজাই মারমা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, খাদ্যশস্যের এই প্রকল্পগুলো পুরোটায় অস্থিত্বহীন। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, প্রকল্পগুলো কাগজেপত্রে নামে আছে কাজে নাই।
বিগত ১৬ বছরের খাদ্যশস্য প্রকল্পের তথ্যগুলোর মধ্যে সম্প্রতি কয়েক বছরের প্রকল্পগুলো সরেজমিনে তদন্তে নেমে দেখা যায়,
লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের একটি প্রকল্প হচ্ছে দুলাল পাড়া থেকে বেলাল পাড়া রাস্তা সংস্কার। কিন্তু আজিজনগরে দুলাল পাড়া আর বেলাল পাড়া বলতে কোন পাড়াই খোঁজে পাওয়া যায়নি এই ইউনিয়নে। পরে একই ইউনিয়নে জাহেদুল পাড়া পুকুর সংস্কার এবং ওয়াহেদুল পাড়া পুকুর সংস্কারের কাজ কতটুকু বের করার চেস্টা করা হয়। কিন্তু আজিজনগরে কোন জাহেদুল পাড়া আর ওয়াহেদুল পাড়া নামেরও কোন পাড়াই খোঁজে পাওয়া যায়নি।
পরে সরে জমিনে ফাইতং এর কামাইরগা ঝিরি থেকে চিউনি পাড়া রাস্তা সংস্কার আর ফাইতং জাদিদং পাড়া রাস্তা সংস্কারের কাজ কতটুকু দেখার চেস্টা করা হয়। কিন্তু এই ইউনিয়নে কামাইরগা ঝিরি থেকে চিউনি পাড়া সংস্কার করার মতো কোন রাস্তাই নেই এবং ফাইতং জাদিদং পাড়ার বিগত কয়েক বছরে কোন সংস্কারই করা হয়নি।
এভাবে লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ঠান্ডাঝিরি রাস্তা সংস্কার, ডলুঝিরি হতে রাবার বাগান রাস্তা সংস্কার, মরুঝিরি বাঁধ সংস্কার, ডেসটিনি বাগান থেকে লম্বাশিয়া রাস্তা সংস্কার এবং ২নং ওয়ার্ডের গরীব মহিলাদের মাঝে হাঁস-মুরগী ও ছাগল বিতরণসহ অসংখ্য প্রকল্প সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। ঐখানে সংস্কার কাজের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
এবার সরেজমিনে যাওয়া হয়, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের কলাঝিরি ছাউনি পাড়া যাওয়ার রাস্তা সংস্কার, সদর ইউপির ১ নং ওয়ার্ডে দুস্থ মহিলাদের মাঝে হাস-মুরগি বিতরণ। এখানে ছাউনি পাড়া নামেন কোন পাড়ার অস্থিত্ত্ব পাওয়া যায়নি। তাছাড়াও সদর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের দুস্থ মহিলাদের হাঁস-মুরগি বিতরণের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি
এভাবে বান্দরবান সদর উপজেলার জামছড়ি ইউনিয়নের কামদং পাড়া সামাজিক পুকুর সংস্কার, রোয়াংছড়ি রাস্তার মাথা হইতে সামুকঝিড়ি রাস্তা সংস্কার, কুহালং ইউনিয়নের ক্যমলং পাড়া শশানের যাওয়ার রাস্তা সংস্কারসহ প্রায় দেড়শ টিরও অধিক প্রকল্প সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। কিন্তু কোন কাজের অস্থিত্ত্ব খোঁজে পাওয়া যাইনি।
মোট কথা কাগজেপত্রে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোন অস্তিত্ত্ব নাই প্রকল্পগুলোর । এমনকি কিছু কিছু জায়গায় যাদেরকে প্রকল্প চেয়ারম্যান দেখানো হয়েছে তাদেরও কোন অস্থিত্ত্ব পাওয়া যায়নি অর্থাৎ যাদের নামে প্রকল্প দেখানো হয়েছে তাদেরকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এগুলো থেকে বুঝা যায় খাদ্যশস্য প্রকল্পের পুরোটাই ভুয়া এবং ভূয়া স্থান এবং ব্যক্তি দেখিয়ে লুটপাট ও আত্মসাত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা জানায়, নামে বেনামে প্রকল্প সাজিয়ে মুলত লুটপাট করেছে বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা। প্রকল্পগুলোর সরেজমিনে কোন অস্থিত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জনপ্রতিনিধি বলেন, কোন অফিসার যাতে তদন্ত করতে যেতে না পারে বেশ কিছু প্রকল্প দূর্গম এলাকাগুলোতে দেখানো হয়েছে যেখানে শুধু কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। কোন যানবাহন চলে না।
কেন কাগজে পত্রে ভুতুড়ে প্রকল্প তৈরি করে প্রকল্প আত্মসাৎ করা হয়েছে বান্দরবান জেলা পরিষদের হিসাব রক্ষক উসাজাই মারমা থেকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, হিসাব রক্ষক হিসেবে যতটুকু দ্বায়িত্ব পালন করার ততটুকু করেছি তবে চেয়ারম্যান স্যারের অনুমতি ছাড়া আপাতত কিছু বলতে পারবো না আমি। আপনারা উনার সাথে যোগাযোগ করেন।
প্রকল্প দেখাবালের দায়িত্বে থাকা উপ সহকারী প্রকৌশলী থোয়াই চ মং বলেন, প্রকল্পে আমি ছাড়াও আরো সহকর্মী দ্বায়িত্বে ছিল। নিউজ করলে করেন। তাতে আমাদের কিছু যায় আসেনা। এই বলে ফোন কেটে দেন থোয়াই ছ মং।
নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান বলেন, প্রকল্পগুলো আমি দেখি না। হিসাব রক্ষক উসাজাই আর সাব ইঞ্জিনিয়াররা দেখেন।
বান্দরবান জেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাস্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমি যোগদান করেছি মাত্র ৫ মাস হল। তাই এই বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে পারছিনা। প্রকৌশল সাইটটা নির্বাহী প্রকৌশলী দেখলেও অফিসের সব বিল উত্তোলন হয় আমার আর চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে।
এ ব্যাপারে বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লার বক্তব্যের জন্য সরাসরি দুই বার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনেও অসংখ্যবার কল করা হয়। কিন্তু রিসিভ হয়নি। পরে ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয় হোয়াটসএ্যাপ এবং ম্যাসেজে। কিন্তু তারপরও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।