বান্দরবান জেলা পরিষদ সদস্য মোজাম্মেল হক বাহাদুর ও জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ন্যস্ত বিভাগ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন তারা দুই জনে মিলে। মোজাম্মেল হক বাহাদুর পুরো বান্দরবানে জনস্বাস্থ্যের মাফিয়া হিসেবেও পরিচিত।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যত কাজের টেন্ডার হয় সব তার (মোজাম্মেল হক বাহাদুর) কিন্তু নিজের কোন লাইসেন্স ব্যবহার না করে ৭ পার্সেন্ট সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্য ইউ.টি মং ও রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যা নামের দুটি উপজাতীয় লাইসেন্স ব্যবহার করেন সে। জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের নথীতে দেখা যায় পুরো বান্দরবানে শতাধিক লাইসেন্স থাকলেও অলৌকিকভাবে এই দুই লাইসেন্স ছাড়া জনস্বাস্থ্যের কোন কাজ কোন টিকাদার পায়না।
কেন দুইটি লাইসেন্স ঘুরেফিরে ব্যবহার হয় মোজাম্মেল হক এবং নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দেকে জিজ্ঞেস করা হলে তারা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে উল্টো আরো বলেন, ” আমি দশ বছর ধরে এক্সইএন। আমি সব বুঝি। আপনি বাকী টিকাদারদের ঘর থেকে ডেকে নিয়ে এসে টেন্ডার মারতে বলেন। আপনিও লাইসেন্স বানিয়ে কাজ করেন।”
মুলত অনুসন্ধান বলছে, গোপনে নিগোসিয়েশনের মাধ্যেমই এই টেন্ডার ড্রপ করা হয় এবং বাকীদের কোন সিডিউল কিনতে দেওয়া হয়না। তবে যাদেরকে সিডিউল কিনতে দেওয়া হয়না তাদেরকে একটা পার্সেন্টিজ যে কাজটি পাবে সে তাদের মাঝে বণ্টন করে দেয়। এই চর্চাটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বান্দরবান জনস্বাস্থ্যে।
ঠিকাদার মোজাম্মেল হক জনস্বাস্থ্যের কাজগুলো নিজের আয়ত্বে রেখে এভাবে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প লুটপাট করে চলছেন প্রতিনিয়ত আর তাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে নিজেই।
তাছাড়াও জনস্বাস্থ্যের প্রত্যেক প্রকল্প থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দেকে ১০ পার্সেন্ট হারে টাকা দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে যদিও বা নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
এদিকে জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে মোজাম্মেল হক বাহাদুরকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেখাশুনা করার জন্য কিন্তু তিনি বনে গেছেন ঠিকাদার। যেখানে অন্য ঠিকাদারদের নির্বাহী প্রকৌশলী ও মোজাম্মেল হক ন্যস্ত কাজ বন্টন করে দিবেন এবং এগুলো দেখাশুনা করবেন সেখানে অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে তিনি (মোজাম্মেল) নিজেই কাজ করে চলছেন। আর নির্বাহী প্রকৌশলী তাকে সব দিক দিয়ে সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন।
আরো মজার বিষয় হচ্ছে যে দুই জন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে তারাও জানেনা তাদের নামের লাইসেন্স দিয়ে কে কে কাজ করছে বা কোথায় কোথায় কাজগুলো চলমান আছে বা কাজ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দুই লাইসেন্সের মালিক রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যা ও ইউ টি মং দুই জনকে তাদের লাইসেন্স ব্যবহারের জন্য মোটা অংকের একটা পার্সেন্টেটিজ দিয়ে দিতে হয়।
এ ব্যাপারে ঠিকাদার রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি স্বীকারও করেন, কাজগুলো তার লাইসেন্স ব্যবহার করে হয় কিন্তু তিনি কাজগুলো করেন না। বান্দরবানে শতাধিক লাইসেন্স থাকতে আপনার লাইসেন্স কেন এতো কাজ পায় জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি। তাছাড়াও তিনি নিজে এবং বিভিন্ন ঠিকাদার দিয়ে কল করিয়ে প্রতিবেদককে কনভিন্স করার চেস্টাও করেন।
ঠিকাদার ইউ টি মং এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, সাংবাদিক পরিচয় দেওয়াতে তিনি ব্যস্ততা অজুহাত দেখিয়ে কল কেটে দেন।
জনস্বাস্থ্যে প্রকৌশলের বিভিন্ন প্রকল্পের বেশকিছু নথী প্রতিবেদকের হাতে এসেছে যেখানে প্রায় শত কোটি টাকার প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এবং একক আধিপত্য বিস্তার করে প্রকল্পগুলোর কাজ করেছেন মোজাম্মেল হক বাহাদুর।
প্রকল্পগুলোতে মোজাম্মেলের সাথে ছিলেন তার আপন দুই ভাই রুবেল ও জহির ও তার দুইজন পার্টনার মোস্তফা হুজুর ও কামাল। তাদেরকে দিয়ে মুলত মোজাম্মেল হক কাজগুলো করান। কাজগুলো করানোর জন্য তার বেশ কয়েকজন কর্মচারিও রয়েছে যারা বিভিন্ন সাইটগুলো দেখাশুনা করেন। মুলত এভাবেই এই কয়েকজন মিলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছেন তারা।
নথীতে উল্লেখ থাকা একটি প্রকল্প হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৪৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আর্থিক বরাদ্দ দিয়ে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিকট বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাথুরে এলাকার জি.এফ.এস. ও উপজেলার সকল এলাকায় ডীপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ করণ।
অন্য আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ৪৪ কোটি ২৫ লাখ ১০০ টাকার আর্থিক বরাদ্দে দিয়ে একই অধিদপ্তরকে বান্দরবান পৌরসভা ও বান্দরবানের তিন উপজেলা সদরসহ পাশ্ববর্তী এলাকা সমূহ নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন।
এই প্রকল্পের কাজগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় শতকোটি টাকার পুরো প্রকল্পই বৃথা এবং অধিকাংশ প্রকল্পই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তাছাড়াও কোন কাজেই আসছেনা এই প্রকল্পগুলো। কিছু কিছু জায়গায় প্রকল্পের কাজই করেনি আবার কিছু জায়গায় কাজ অর্ধেক করে প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে।
এদিকে তাদের এই শত কোটি টাকার প্রকল্পগুলোতে দূর্নীতির কারনে পুরো বান্দরবান জুড়ে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানি সংকট। যেখানে প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সুপেয় পানির বন্যা বসিয়ে দেওয়া যেতো সেখানে হাজার হাজার মানুষ আজ পানির জন্য হাহাকার করছে। ৩/৪ কিলোমিটার দূর থেকে পায়ে হেটে গিয়ে পানি আনতে হচ্ছে। দেখার যেনো কেউ নাই।
আলীকদম উপজেলা সদরে এরকম একটি প্রকল্প সরেজমিনে দেখতে গিয়ে এলাকাবাসীরা জানায়, উদ্বোধনের দিন কোনমতে পানি পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে আর কোন পানির দেখা মিলেনি।
লামা সদর ইউনিয়নের বইল্লারচর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রায় ৫০ পার্সেন্টের মতো কাজ করার পর ঠিকাদার আর আসেনি। প্রকল্প এতোটুকুতেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
বিষয়টা নিয়ে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে। কিন্তু অধিদপ্তর খেকে কোন ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি বলে জানায় এলাকাবাসী।
লামা পৌরসভার টিটিএন্ডডিসি এবং আজিজনগর বাজারে অবস্থিত আরো দুইটি প্রকল্প পুরোটাই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এলাকাবাসীরা জানায়, উদ্বোধনের প্রথম দিন পানি পাওয়ার পর থেকে আর কোন দিন তারা পানি পায়নি।
বান্দরবান সদর ইউনিয়নের সুয়ালক মাঝের পাড়া, হাতিভাঙ্গা পাড়ার প্রকল্পগুলোও বর্তমানে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এলাকাবাসীরা জানায়, যেখানে ৫/৬শ ফুট গভীরে গিয়ে ডীপ বসানোর কথা সেখানে তারা ১/২ শ ফুটের মধ্যে কাজ শেষ করাতে এই প্রকল্পগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক ইউপি চেয়ারম্যান জানায়, এই প্রকল্পগুলোতে যে বরাদ্দ আসছে তার ৫০ শতাংশও কাজ করেনি ঠিকাদারেরা। যার কারনে শতকোটি টাকার প্রকল্পগুলো কাজে আসছেনা।
এ ব্যাপারে মোজাম্মেল হক বাহাদুর বলেন, জনস্বাস্থ্যের প্রকল্প সবগুলোর কাজ আমি করিনি, লাইসেন্স দুটি আমি ছাড়াও অনেকেই ব্যবহার করে। আমরা অনেক কষ্টে আছি যেটা আপনাদেরকে বলতে পারছিনা। আমাদেরও অনেক কিছু মেনটেইন করতে হয়। আপনারা নিউজ করলে এডিবির একটা ফান্ড আসার কথা আছে। সেটিও আসা বন্ধ হয়ে যাবে।